ভারতকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক: বাস্তবতা, সম্ভাবনা নাকি রাজনৈতিক কল্পনা?

ভারতকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক: বাস্তবতা, সম্ভাবনা নাকি রাজনৈতিক কল্পনা?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জনপরিসরে যত বিতর্ক হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—বাংলাদেশ কি ভারতকে পাশ কাটিয়ে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে নতুন কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে? প্রশ্নটি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাহিদা—সব মিলিয়ে এই প্রশ্নটি আজ শুধু রাজনৈতিক নয়, কৌশলগতও।

ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান

সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে দুটি বিপরীত অবস্থান প্রায়ই দেখা যায়। একদল মনে করে, ভারত বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করে; তাই চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়াই হবে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রকাশ। অন্যদিকে আরেক দল মনে করে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল করা মানেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি কোথাও।

রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। রাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না; থাকে স্থায়ী স্বার্থ। সেই স্বার্থের আলোকে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি হওয়া উচিত—ভারতকে বাদ দেওয়া সম্ভব কি না—তা নয়; বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই কীভাবে চীন, পাকিস্তান এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে এমন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, যাতে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী হয়।

প্রথমেই একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি—বাংলাদেশের ভূগোল কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে পরিবর্তন করা যাবে না। বাংলাদেশের প্রায় পুরো স্থলসীমা ভারতের সঙ্গে। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ ভারতের মাধ্যমে। সমুদ্রপথ থাকলেও স্থলবাণিজ্য, ট্রানজিট, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃনদী ব্যবস্থাপনা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহেও ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনীতিতে একটি বহুল ব্যবহৃত কথা আছে—Geography is destiny। অর্থাৎ, কোনো রাষ্ট্র তার ভূগোলকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করতে পারে না।

এই বাস্তবতা থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—ভারতকে বাদ দেওয়া বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? যদি এর অর্থ হয় ভারতের সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক বা নিরাপত্তা সহযোগিতা বন্ধ করা, তবে সেটি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু সরকারনির্ভর নয়; এটি নদী, সীমান্ত, জ্বালানি, বাণিজ্য, মানুষের যাতায়াত এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বহু স্তরে বিস্তৃত।

তবে এটিও সত্য যে, ভৌগোলিক বাস্তবতা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ করলেও, তা ভারতের ওপর একক নির্ভরতার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না। গত দুই দশকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগিয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি মূলত অর্থনীতি ও অবকাঠামো। পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়নে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশও চীনা উৎস থেকে এসেছে। নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুদ্ধসরঞ্জাম পর্যন্ত চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা প্রয়োজন। অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ এবং সামরিক মিত্র—এই দুটি বিষয় এক নয়। চীন বাংলাদেশকে অস্ত্র বিক্রি করে, প্রশিক্ষণ দেয়, প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়। কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি দুই দেশের মধ্যে নেই। অর্থাৎ সংকটের মুহূর্তে চীন বাংলাদেশের পক্ষে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে—এমন ধারণার পক্ষে বাস্তবভিত্তিক প্রমাণ নেই।

চীনের বৈদেশিক নীতির ইতিহাসও একই কথা বলে। বেইজিং সাধারণত অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে অগ্রাধিকার দেয়। সামরিক উপস্থিতি বাড়ালেও সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সতর্ক। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চীনের ঘনিষ্ঠতা বহু দশকের কৌশলগত বাস্তবতার ফল; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই মাত্রার নিরাপত্তা অঙ্গীকার এখনো গড়ে ওঠেনি।

পাকিস্তানের প্রসঙ্গে আসা যাক। স্বাধীনতার ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন আবেগ ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অতীতের স্মৃতিতে স্থির থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। এটি স্বাভাবিক এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অধিকারও বটে।

কিন্তু এখানেও বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান ভারতের বিকল্প হতে পারে না। দুই দেশের মধ্যে কোনো স্থলসীমা নেই, বাণিজ্যের পরিমাণ সীমিত, পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং অর্থনৈতিক পরিপূরকতার ক্ষেত্রও সীমিত। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে, কিন্তু সেটি ভারতের ভূরাজনৈতিক ভূমিকা প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—ভারত কি বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করে? এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা কিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে এবং সেই সমালোচনার একটি অংশ বাস্তব সমস্যার ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এসব বিষয়ে আরও কার্যকর কূটনৈতিক অবস্থান নিতেই পারে। কিন্তু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ থাকা এবং সেই রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ কৌশলগত সমীকরণ থেকে বাদ দেওয়া—এই দুটি ভিন্ন বিষয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ভিয়েতনাম চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুর একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে। কারণ ছোট ও মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রগুলো বুঝে গেছে—একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত তাদের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে। একে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক Strategic Balancing বা Multi-vector Foreign Policy বলে থাকেন। এর মূল ধারণা হলো—কোনো একটি শক্তির প্রভাববলয়ে প্রবেশ না করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে এমন সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে প্রত্যেকের সঙ্গে সহযোগিতা করা যায়, কিন্তু কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে না হয়।

বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতবিরোধী কোনো সামরিক বা কৌশলগত জোটে যোগ দেয়, তাহলে তার সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে? প্রথমত, আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয়ত, বাণিজ্য ও ট্রানজিটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান বা ইউরোপীয় অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। অর্থাৎ একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো কূটনৈতিক পরিবেশে তার প্রতিফলন ঘটে।

অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানো, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ—এই ধরনের বহুমুখী উদ্যোগ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে বরং আরও শক্তিশালী করতে পারে। কারণ এতে কোনো একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠবে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সম্ভবত এখানেই—বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা কোথায়?

অনেকেই নিরাপত্তাকে শুধু যুদ্ধবিমান, ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যায় পরিমাপ করেন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নিরাপত্তার ধারণা অনেক বিস্তৃত। খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ কূটনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও টেকসই হয় না। আবার দক্ষ কূটনীতি ছাড়া শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।

বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ধরে রাখা। ভারতকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিরূপ না করে, আবার ভারতের ওপর অতিনির্ভরতাও এড়িয়ে চলা। চীনের বিনিয়োগ গ্রহণ করা, কিন্তু ঋণঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা, কিন্তু সেটিকে ভারতের বিকল্প হিসেবে কল্পনা না করা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক আরও গভীর করা।

সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—রাষ্ট্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত বিদেশি মিত্রের ওপর নয়, নিজের সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি দক্ষ অর্থনীতি, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প, কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পেশাদার কূটনীতি—এসবই বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত নিরাপত্তার ভিত্তি।

ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ নতুন কৌশলগত অক্ষ গড়ে তুলতে পারবে কি না—এই প্রশ্নের সরল উত্তর তাই "হ্যাঁ" বা "না" নয়। বাস্তব উত্তর হলো, বাংলাদেশকে কাউকে বাদ দিয়ে নয়; বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে এগোতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগের স্থায়িত্ব কম, কিন্তু ভূগোল, অর্থনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের বাস্তবতা দীর্ঘস্থায়ী।

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ